নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 77 বার পঠিত
দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক মন্দা; ক্রয়াদেশ হ্রাস; উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটের বহুমুখী চাপের মধ্যে পোশাক শিল্প যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন ১০-৩০ কাউন্ট সুতার আমদানির বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করায় নতুন সংকটের সূত্রপাত। পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন-বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এই সিদ্ধান্তকে ‘চরম আত্মঘাতী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গার্মেন্টস শিল্পে তীব্র সুতা সংকট সৃষ্টি হবে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো খাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন শুধু অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে নেই, আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপে প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউনিটমূল্য, রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থান সবই প্রভাবিত হবে।
গত ৫ মাস ধরে বিশ্বের ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি কমেছে ২.১৯ শতাংশ। বিশেষ করে ডিসেম্বরে রপ্তানি কমেছে ১৪.২৫ শতাংশ। শীর্ষ পাঁচ খাতের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল ও পাটজাত পণ্যÑ সবকটির রপ্তানি কমেছে। মোট রপ্তানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে এই খাতগুলো থেকে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের অংশ একাই ৮১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।
সুতা নিয়ন্ত্রণ, বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এ সব সংকট একসঙ্গে প্রতিফলিত হলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা মনে করেন, সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে স্পিনিং খাত রক্ষা করা সম্ভব নয়। দেশে উৎপাদিত সুতার ৮৫-৯০ শতাংশই রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত হয়। ফলে ক্রয়াদেশ কমে গেলে স্পিনিং খাতও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে না।
জানা যায়, ভারত থেকে আমদানি কমাতে ১০-৩০ কাউন্টের কটন ও ব্লেন্ডেড সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ বা বন্ড সুবিধা বাতিলের দাবি করে গত ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে একটি চিঠি দেয় বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। বিটিএমএর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন ৫ জানুয়ারি সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরদিনই ট্যারিফ কমিশন ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। এই প্রক্রিয়ার আপত্তি জানিয়ে ৬ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশনকে পৃথক চিঠি দেয় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
সব পক্ষকে নিয়ে ৮ জানুয়ারি সভা করে ট্যারিফ কমিশন। সভায় বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেন। ফলে সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়। গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করে এনবিআরকে। ভারতসহ অন্য দেশ থেকে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ নিয়ে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
২২ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিটিএমএ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “দেশের বস্ত্র খাত জাতীয় সংকটের মুখোমুখি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা ‘স্টেট অব ইমার্জেন্সি’-তে রয়েছি। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা না পেলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবো।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের স্পিনিং মিলগুলো করপোরেট কর, টার্নওভার কর ও ভ্যাটের চাপ বহন করছে, অথচ সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বজায় থাকায় দেশীয় উৎপাদনকে ব্যর্থ করা হচ্ছে।’’
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান এই দাবিকে যৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে এবং তিনটি অ্যাসোসিয়েশন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ একসঙ্গে বসে সমন্বিত সমাধান বের করতে হবে। তবে মূল দায়িত্ব সরকারেরই।”
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সতর্ক করে বলেন, “দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে নেতিবাচক প্রভাব শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে প্রতিফলিত হবে।”
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “২০২৫ সালে দেশের তৈরি পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারে, প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। মোট রফতানির বড় অংশই নিট পোশাক নির্ভর, যেখানে ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতার ব্যবহার বেশি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সুতা আমদানির সহজলভ্যতা অপরিহার্য।”
বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, “বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটÑ এই তিনটি চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শিল্প এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ঠিক এই সময়ে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে, যা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ হলে তা রপ্তানির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা দেশীয় স্পিনিং মিল রক্ষার পক্ষে, তবে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করলে তৈরি পোশাক শিল্প বড় সংকটে পড়বে। গত ছয় মাস ধরেই রপ্তানি নিম্নমুখী।”
Posted ৩:৫৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy